লোহাগাড়া ভূমি অফিসে ঘুষের দৌরাত্ম্য: বিকেল জুড়ে চলে দেনদরবার
লোহাগড়া প্রতিনিধি মাহামুদুর হক চৌধুরী :- লোহাগাড়ার ভূমি অফিসে ঘুষের রাজত্ব, বিকেলে চলে দেনদরবার লোহাগাড়া উপজেলা ভূমি অফিসে সরকারি ফি মাত্র ১১৭০ টাকা হলেও বাস্তবে নামজারি বা খাজনা দিতে সাধারণ মানুষকে গুনতে হচ্ছে ৩০ থেকে ৪০ হাজার টাকা পর্যন্ত। অফিসের নাজির, সহকারী, কম্পিউটার অপারেটর, তহসিল অফিস, কানুনগো ও সার্ভেয়ারদের সঙ্গে যোগসাজশে গড়ে উঠেছে দালালচক্র, যা সরকারি সেবাকে পরিণত করেছে ঘুষের বাণিজ্যে।
জানা যায়, একটি নামজারি করতে প্রথমে ফাইল জমা দিতে হয় ২০০ টাকা, প্রস্তাবনা পাসে ২ হাজার, সার্ভেয়ার ও কানুনগোকে ১২০০, অনুমোদনের জন্য ১৮০০ এবং ডিসিআর কাটতে ১৪০০ টাকা দিতে হয়। সর্বশেষ তামিল করতে গুনতে হয় আরও ৩০০ টাকা। অথচ সরকারি নিয়ম অনুযায়ী ডিসিআর ফি ছাড়া অতিরিক্ত কোনো খরচের বিধান নেই। অপরদিকে, ইউনিয়ন ভূমি অফিস গুলোর মাধ্যমে ভূমি উন্নয়ন কর আদায়ের ক্ষেত্রেও সমন্বয়ের নামে মোটা অংকের টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। অনুসন্ধানে জানা গেছে, ভূমি অফিস চত্বর ও গেইটসংলগ্ন চা-দোকান এলাকায় প্রতিদিন সকাল থেকে বসে থাকে অন্তত পাঁচ শতাধিক দালাল। নামজারি, খাজনা বা মিস মামলার কাজ নিয়ে আসা সেবাপ্রার্থীদের তারা “সহযোগিতার” প্রস্তাব দেয় নিজে গেলে সময় লাগবে, আমরা করলে আজই হবে। এই আশ্বাসে অনেকে তাদের ফাঁদে পড়ে যান। দালালদের কেউ কেউ নির্দিষ্ট তহসিলদার বা সার্ভেয়ারের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ রাখে। প্রতিটি ফাইলের “দর” নির্ধারণ হয় ১০ থেকে ৫০ হাজার টাকায়। এর প্রায় ৩০/৪০ শতাংশ নেয় দালাল, বাকি টাকা ভাগ হয় সংশ্লিষ্ট অফিসকর্মীদের মধ্যে। বিকেলবেলা অফিস বন্ধ হওয়ার পর শুরু হয় দেনদরবার। অফিস সংলগ্ন চা-দোকানও পেছনের টিনঘরেই চলে হিসাব-নিকাশ। সাধারণ মানুষের অভিযোগ, লোহাগাড়ার ভূমি অফিসে সেবা পেতে অতিরিক্ত টাকা না দিলে কাজ হয় না। রফিক উদ্দিন নামের এক ভূমির মালিক বলেন, আমি নিজে তিন মাস চেষ্টা করেও কাজ পাইনি। পরে এক দালালকে ২৫ হাজার টাকা দেওয়ার পর তিন দিনের মধ্যেই ফাইল অনুমোদন হয়ে যায়। অন্যদিকে নামজারি ও খতিয়ান সংক্রান্ত জটিলতায়ও হয়রানির অভিযোগ রয়েছে। শফিক উদ্দিন নামের এক যুবক বলেন, আমি ১০ বছর আগে নামজারি করেছিলাম। সম্প্রতি খাজনা দিতে গিয়ে দেখি আমার খতিয়ান বাতিল দেখানো হয়েছে। পরে জানতে পারি অন্য কারও খতিয়ান বাতিলের তামিল আমার ফাইল থেকে কেটে নেওয়া হয়েছে। আরেক ভুক্তভোগী ইঞ্জিনিয়ার মো. নাছির উদ্দিন বলেন, দলিল দাতাদের নামে বিএস খতিয়ান প্রচারিত থাকা নামজারির অন্যতম পূর্বশর্ত। কিন্তু বিএস খতিয়ানে দলিল দাতাদের নামে জরিপে নাম না থাকলেও দালাল চক্রের সহায়তায় জালিয়াতির মাধ্যমে খতিয়ান সৃজন করা হয়। আমার বসতবাড়ির জায়গাটি আমাদের নামে বিএস রেকর্ডভুক্ত। তবুও আমাদের রেকর্ডীয় জমি অন্য ব্যক্তির নামে নামজারি হওয়ায় আমি হতবাক। মিরাজ নামের এক যুবক বলেন, আমি নিজেই আবেদন করে স্বশরীরে গিয়ে নামজারির আবেদন ফাইল জমা করেছি। কোন কাজ না হওয়াতে ভূমি অফিসের এক লোককে ধরে ২৫ হাজার টাকার বিনিময়ে নামজারিটি দ্রুত সময়ের মধ্যে হাতে পেয়েছি। টাকা দিলে ভূমি অফিসে সব সম্ভব বলে মন্তব্য তিনি। পদুয়া ইউনিয়নের ভারপ্রাপ্ত তহসিলদার জিয়া উদ্দিন বলেন, দালালরা মূলত অফিসের বাইরে সক্রিয়। অফিস ব্যবস্থাপনায় শৃঙ্খলা আনতে আমরা কাজ করছি। আমরাও চাই সেবা গ্রহিতারা সরাসরি এসে সেবা নিতে। টাকা ছাড়া ফাইল প্রস্তাব হয়না এমন প্রশ্ন করা হলে তিনি বিষয়টি এড়িয়ে যান। উপজেলা ভূমি অফিসের সার্ভেয়ার কাম কাননগো নূরে আলম বলেন, কোনো ফাইলের জন্য বাড়তি টাকা হয় না। সেবা দিতে অনেক সময় রাতে অফিস করা হয় বলে স্বীকার করেন এই কর্মকর্তা। লোহাগাড়া উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) মং এছেন বলেন, আমি বিষয়টি জানি না। তবে কোথাও যদি দালাল বা ঘুষের লেনদেনের প্রমাণ পাওয়া যায়, কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। ভূমি অফিসে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে আমরা নিয়মিত মনিটরিং করছি।